সোমবার, অক্টোবর ১২, ২০২৬
 শিরোনাম
ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ জনের মৃত্যু, প্রাণহানি ছাড়াল ৩০০ সৌদি আরব থেকে ১০ হাজারের বেশি প্রবাসীকে ফেরত, গ্রেপ্তার ১৪ হাজার গরুর মাংসের দাম ২৫০ টাকা নির্ধারণের দাবি, সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ কন্যাশিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে বাল্যবিবাহ ও বৈষম্য বন্ধের আহ্বান রাষ্ট্রপতির নারীর স্বাস্থ্য ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবায় ২৫০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগে বাংলাদেশ-ইআইবির উদ্যোগ আগামীকাল থেকে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু গড়াই নদীতে ‘শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু’ নির্মাণে প্রশাসনিক পদক্ষেপের নির্দেশ বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট দ্রুত গ্রিডে যুক্ত হবে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন

বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস

বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস

আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস আজ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ সৃষ্টির আহ্বানের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

এবারের দিবসে বাল্যবিয়ে বন্ধ এবং কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে কন্যাশিশুর অগ্রগতির পথে অন্যতম বড় বাধা বাল্যবিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। একই বয়সী নারীদের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে।

অন্যদিকে, ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। জরিপের এসব পরিসংখ্যান বলছে, অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। এ পরিস্থিতি কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার তাগিদ দিচ্ছে।

বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য রয়েছে। এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার রাজশাহী বিভাগে ৬৭ শতাংশ এবং খুলনা বিভাগে ৬৫ শতাংশ। রংপুরে এ হার ৬৩ শতাংশ, বরিশালে ৬১ শতাংশ এবং ঢাকায় ৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে, সিলেট বিভাগে এ হার ২৯ শতাংশ।

আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গেও বাল্যবিয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৬৫ শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের ক্ষেত্রে তা ৪২ শতাংশ। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতি কীভাবে কন্যাশিশুর জীবনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, এ বৈষম্য তারই একটি চিত্র তুলে ধরে।

দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, যৌতুকের চাপ, প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাল্যবিয়ের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সংকট কিংবা মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেও অভিভাবকেরা অল্প বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে সমস্যাটির সমাধানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোও মোকাবিলা করা জরুরি।

বাল্যবিয়ে শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি কন্যাশিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অল্প বয়সে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের কারণে কিশোরীদের গর্ভাবস্থা এবং প্রসবকালীন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি অপর্যাপ্ত পুষ্টি, প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের অভাব এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বাল্যবিয়ের পর অনেক কিশোরীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। সংসার ও সন্তান পালনের দায়িত্ব তাদের ওপর এসে পড়ে অল্প বয়সেই। এতে ব্যক্তিগত বিকাশ, দক্ষতা অর্জন ও ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বাল্যবিয়ে ও অল্প বয়সে গর্ভধারণ কন্যাশিশুর স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, অপুষ্টিতে ভোগা এবং গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।

এ কারণে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের পাশাপাশি কিশোরীদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বয়সোপযোগী প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ রয়েছে। এ আইনে সাধারণভাবে বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের নির্দেশ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যতিক্রমের বিধান রয়েছে।

আইন থাকা সত্ত্বেও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, জন্মনিবন্ধন যাচাই এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা কন্যাশিশুদের শনাক্ত করে তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

কন্যাশিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য শিক্ষাসহায়তা, উপবৃত্তি, নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষাপরিবেশ এবং কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে বাল্যবিয়ের হার বেশি, সেখানে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং কিশোরীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুতি, আয় কমে যাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হলে কন্যাশিশুরা আরও ঝুঁকিতে পড়ে। তাই দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালনের উদ্যোগের সূত্রপাত ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলনে। পরে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১২ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বাল্যবিয়ে বন্ধ করা গেলে মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

দিবসটিতে মূল প্রত্যাশা, কন্যাশিশুর অধিকার যেন কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। আইন প্রয়োগ, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিটি মেয়ের জন্য নিরাপদ শৈশব এবং নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।