বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬
 শিরোনাম
আইসিএপিপির ১৩তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে সিউলে বিএনপি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীর করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে শিল্পাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে ৭ নভেম্বর সরকারের ব্যাপক আয়োজন জ্বালানি অনুসন্ধানে ব্রুনাইয়ের বিনিয়োগ চাইল বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় নজরদারি নীতিমালা ও কারিকুলাম পরিমার্জনের উদ্যোগ: ববি হাজ্জাজ তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা, পাঁচ খাতে প্রবৃদ্ধি ১২-২৭ শতাংশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও কমনওয়েলথের বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার অনুরোধ ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মাজারে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতার শ্রদ্ধা

তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা, পাঁচ খাতে প্রবৃদ্ধি ১২-২৭ শতাংশ

তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা, পাঁচ খাতে প্রবৃদ্ধি ১২-২৭ শতাংশ

দেশের রপ্তানি খাতে বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি রাসায়নিক পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, বিশেষায়িত বস্ত্র, চামড়া এবং প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এসব খাতের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৭০৯ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি বিকাশমান পাঁচটি অপ্রচলিত রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত।

খাতভিত্তিক হিসাবে রাসায়নিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২৭ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্যে ২৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিশেষায়িত বস্ত্রে ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং প্রকৌশল পণ্যে ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

রপ্তানির এই চিত্র তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে নতুন নতুন শিল্প খাতকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদন, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে।

রাসায়নিক ও ওষুধশিল্পে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি

রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাসায়নিক পণ্য খাত। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দেশের ওষুধশিল্প। চার মাসে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদেশের বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ বাসসকে বলেন, রাসায়নিক পণ্য, বিশেষ করে ওষুধশিল্পের এই অগ্রগতি দেশে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিফলন। রপ্তানি বহুমুখীকরণে এ খাত ক্রমেই সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।

পাটপণ্যে বৈশ্বিক বাজারের নতুন সুযোগ

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি।

বিশ্ববাজারে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা এ শিল্পের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, বিশ্বজুড়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় বাংলাদেশের পাটশিল্পের সামনে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেজিইএ) ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ায় এ খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আফ্রিকার দেশগুলোসহ নতুন নতুন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে।

কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ উদ্যোগ স্থানীয় শিল্পের জন্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এতে দেশে পাটের মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং তৈরি পাটপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ড. কামরুজ্জামান বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানির পরিবর্তে উচ্চমূল্যের পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পাটশিল্পের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

বিশেষায়িত বস্ত্রে বাড়ছে সম্ভাবনা

বিশেষায়িত বস্ত্র খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এ খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি।

প্রচলিত পোশাকের বাইরে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাপড়, প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্র, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত বিশেষ উপকরণসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। এসব পণ্যে তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নত করা এবং উচ্চমূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বিশেষায়িত বস্ত্র খাত রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চামড়াজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত

দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতও রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি।

আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার উদ্যোগ, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব এবং বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এ খাতের রপ্তানি আয় বাড়ছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্থানীয় কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পের সুযোগ থাকায় চামড়া খাত বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত রপ্তানি খাত।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, পণ্যের মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিলে আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্যের অংশে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

প্রকৌশল পণ্যে বাড়ছে রপ্তানি আয়

প্রকৌশল পণ্য খাতেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি।

এ খাতের আওতায় রয়েছে সাইকেল, যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্য।

প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনের সুযোগ থাকায় প্রকৌশল পণ্যকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রকৌশল পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণে অগ্রগতির ইঙ্গিত

ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে উদীয়মান পাঁচটি রপ্তানি খাতের প্রতিটিতেই সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে রাসায়নিক পণ্যে প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রায় পাঁচ গুণ এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে চার গুণের বেশি।

অন্যদিকে বিশেষায়িত বস্ত্র, চামড়া ও প্রকৌশল পণ্যেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাক খাত থেকে এলেও অন্যান্য খাতের এই অগ্রগতি রপ্তানি আয়ের উৎস সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, সর্বশেষ রপ্তানি পরিসংখ্যান দেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে নীতিগত সহায়তা, নতুন বাজার অনুসন্ধান, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি।

তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি নতুন নতুন রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বহুমুখী শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।